মহর্ষি বাল্মীকির জীবন পরিচয় | Maharishi Valmiki Biography in Bengali

মহর্ষি বাল্মীকির জীবন পরিচয়
Maharishi Valmiki Biography in Bengali


নামমহর্ষি বাল্মীকির/Maharishi Valmiki
আসল নামরত্নাকর
পিতার নামপ্রচেতা
জন্ম দিবসআশ্বিন মাসের শারদ পূর্নিমা তিথি
পেশাডাকাত, মহাকবি
রচনারামায়ণ

মহর্ষি বাল্মীকির নাম আশা করি তুমি নিশ্চই শুনেছ | তিনিই হলেন হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণের স্রষ্টা এবং আদিকবিও | বাল্মিকীর জন্ম তারিখ সম্বন্ধে তেমন কোনো তথ্য জানা যায়নি কিন্তু শোনা যায় তিনি আশ্মিন মাসের শারদ পূর্নিমা তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন এক ব্রাহ্মন পরিবারে |

মহর্ষি বাল্মীকির পিতার নাম ছিলো প্রচেতা কিন্তু তাঁর মাতার নাম সম্বন্ধে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়না |

Life Story of Maharishi Valmiki:

তুমি কি জানো, মহর্ষি বাল্মীকির নাম কিন্তু প্রথম থেকেই মহর্ষি “বাল্মীকি” ছিলো না | তাঁর আসল নাম ছিলো রত্নাকর, যাকে আমরা সবাই একজন ডাকাত হিসাবেই চিনেছি | কিন্তু তাঁর এই ডাকাতে পরিণত হওয়ার পিছনে একটা কারণ আছে, যেটা হয়ত তুমি নিশ্চই জানোনা :

রত্নাকর যখন ছোট ছিল, তখন সে একদিন একটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যায় | যখন অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও সে ফিরে আসেনা, তখন তাঁর মাতা ও পিতা মিলে তাঁকে খোঁজার জন্য জঙ্গলের উদ্দেশ্যে যান |

কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে ভীষন খোঁজার পরও যখন তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়না, তখন তাঁর পিতা-মাতা ভেবেই নেন যে তাঁর পুত্র জঙ্গলের কোনো হিংস্র জন্তুর পাল্লায় পরে প্রাণ হারিয়েছে | তাই এরপর দুঃখী মনে তাঁরা আর তাঁর পুত্রের খোঁজাখুঁজি না করে শেষে বাড়ি ফিরে যান |

পরে, একজন ব্যাধ সেই জঙ্গলের মধ্যে রত্নাকরকে খুঁজে পান এবং তিনি ঠিক করেন যে তাঁকে সে তার বাড়ি গিয়ে লালন-পালন করবেন | এরপর রত্নাকর সেই ব্যাধের স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হয়ে ওঠেন আর তাঁর বিয়েও হয় |

ধীরে ধীরে, তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা একসময় খারাপ হতে থাকে | নিজের স্ত্রীসহ পরিবারের বাকি সদস্যদের পেট চালানো, তার কাছে আরো কঠিন হয়ে ওঠে | তাই অবশেষে সে ঠিক করে ডাকাতি,লুঠ এবং ছিনতাই করে সে তাঁর পরিবার প্রতিপালন করবে |

এরপর সে নিজ গ্রাম সহ পাশের প্রত্যেকটা গ্রামের মানুষদের উপর আক্রমণ করা শুরু করে দেয় এবং একের পর এক ডাকাতি করতে থাকে | যদি কোনো মানুষ তাঁকে ডাকাতির সময় বাঁধা দেওয়ার চেষ্টাও করতো, তাহলে সে তাকে হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করতো না |

এইভাবেই লোকের ধন-সম্পত্তি লুঠ করে, সে তাঁর পরিবারের পেট চালাতে থাকে |

মহর্ষি বাল্মীকির জীবন পরিচয় | Maharishi Valmiki Biography in Bengali(Photo of Valmiki) Via-Wikipedia

তুমি হয়তো নিশ্চই ভাবছ যে, এই দস্যু রত্নাকরের নাম কীভাবে বাল্মীকি হলো আর  “বাল্মীকি ” নাম দেওয়ার পিছনেই বা কে ছিলেন? যদি তুমি এই সম্বন্ধে জানতে চাও, তাহলে তোমাকে এই গল্পটা নিশ্চই পড়তে হবে:

একদিন রত্নাকর প্রতিদিনের মতো সেইদিনও, জঙ্গলের পথ দিয়ে যাওয়া কোনো মানুষের ধন-সম্পত্তি লুঠ করার অপেক্ষায় লুকিয়ে বসে ছিলো | কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করলো, জঙ্গলের পথ ধরে একজন ঋষি “নারায়ণ-নারায়ন” বলতে বলতে আসছেন সেইদিকেই |

রত্নাকর তখনও জানতো না যে, সেই ঋষি আর কেউ নন বরং স্বয়ং নারদমুনি | এরপর রত্নাকর আর দেরী না করে ঠিক করলেন যে, সে তাকেই লুঠ করবে |

রত্নাকর এবার তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হয়, এবং তাঁকে বলে – “তোমার কাছে যা যা জিনিসপত্র আছে, সেইসবই চটজলদি বার করে ফেলো নাহলে পরিনাম কিন্তু খারাপ হবে” |

নারদমুনি, রত্নাকরের এইরকম হুমকি শুনে মোটেই বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বরং হাসি মুখেই তাঁর কথার জবাব দেন | তিনি রত্নাকরকে বলেন যে, সে তাঁর বীনা ও করতাল নিয়ে নিতে পারে |

রত্নাকর, নারদের এইরকম শান্ত আচরণ দেখে বিস্মিত হয়ে যায় | সে মনে মনে ভাবে, “যেই রত্নাকরের নাম শুনে প্রত্যেকটা মানুষের শরীর কাঁপা শুরু হয়, এই মানুষটা তাঁকে দেখে এত শান্ত ও হাসি মুখে আছে কি করে? সে কি তবে তাঁর নাম জানেনা” |

এরপর নারদমুনি রত্নাকরকে জিজ্ঞাসা করেন যে, সে কেন ডাকাতি,লুঠ এবং ছিনতাই এইসব করে | রত্নাকর তাঁর কথা শুনে অতি গর্বের সাথে তাকে জবাব দেয় যে, সে তাঁর পরিবারের পেট চালানোর জন্য এইসব করে |

Via-Spiritual Awareness

নারদমুনি আবারও রত্নাকরকে প্রশ্ন করেন, সে কি কখনো তাঁর পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসা করেছে, যে তারা তাঁর এই কাজে খুশি কিনা? বা তারা কী সবাই তাঁর পাপের ভাগী হতে ইচ্ছুক কিনা?

রত্নাকর এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁকে বলেন, তাঁর পরিবার নিশ্চই তাঁর এই কাজে খুশি হবে এবং তারা কেউই তাঁর পাপের ভাগী হতেও কোনো দ্বিধা করবে না |

নারদ তাঁকে এবার বলেন যে, সে যেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের থেকেই এর উত্তর জেনে আসে আগে | ততক্ষণ তিনি তাঁর জন্য এই জঙ্গলেই অপেক্ষা করবেন | এরপর রত্নাকরও তাঁর উপদেশ মেনে, বাড়ির দিকে গেলো |

বাড়িতে গিয়ে যখন সে তাঁর বউ এবং পরিবারের বাকি সদস্যদের, নারদের কাছ থেকে শোনা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলো, তখন তারা সবাই পরিষ্কার তাঁকে জানিয়ে দিলো যে, তারা কেউই তাঁর পাপের ভাগী হবে না |

এই কথা শুনে রত্নাকর, কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসলো নারদের কাছে | সে নারদকে অনুরোধ করলো, তাঁকে জীবনের সঠিক পথ দেখানোর জন্য |

নারদমুনি তখন তাঁকে ভগবান রামের স্মরণে যাওয়ার কথা বললেন এবং একনিষ্ট হয়ে তাঁর নামের জপ করতে বললেন তাঁকে | এই কথা শুনে রত্নাকর, ততক্ষনাৎ পাশের একটি গাছের নীচে বসে চোখ বন্ধ করে এক মনে রামের নাম জপের চেষ্টা করলো কিন্তু সে পারলো না |

আরো পড়ুন: ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের জীবন পরিচয়

কারণ যখনই সে “রাম” নাম জপ করার চেষ্টা করছিলো, হিংসাত্মক মনোভাব থাকার কারণে সেটা “মরা মরা” নামে তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল |

হচ্ছে না দেখে, যখন সে আবার নারদের কাছে গিয়ে তাঁর এই সমস্যার কথা বলল, তখন নারদ তাঁকে বলে দেন যে, সে যেন “মরা মরা” নামেই জপ করতে থাকে কারণ একদিন সেটা স্বাভাবিক ভাবেই “রাম” নামে পরিবর্তিত হয়ে যাবে |

রত্নাকর এবার নারদমুনির কথা মতো, আবার গিয়ে ধ্যানে বসে এবং “মরা মরা” নামেই একমনে জপ করতে শুরু করে | সে ধীরে ধীরে এতটাই নিজের ধ্যানে মগ্ন হয়ে পরে, যে তাঁর আর খাদ্য ও তেষ্টার দিকে মনই যায়না |

এইভাবে অনেক বছর কেটে যায় | রত্নাকরের সারা শরীরের উপর পিপড়েরা একসময় মাটির ঢিবির বাসা তৈরী করে ফেলে, যারফলে সে পুরো মাটির নীচে ঢেকে যায় |

পুণরায় অনেক বছর পর, নারদমুনি আবার সেই জঙ্গলের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন | পথে তিনি লক্ষ্য করেন একটি মাটির ঢিবির ভিতর কেউ অনবরত রাম নাম করে চলেছেন | তিনি বুঝতে পারলেন এই গলার শব্দ আর কারোর নয় বরং স্বয়ং রত্নাকরের |

তিনি এরপর সেই মাটির ঢিবির সামনে গিয়ে অতি প্রেমপূর্বক সেখান থেকে মাটি সরাতে থাকেন রত্নাকরকে উদ্ধার করার জন্য | অবশেষে যখন তাঁর মাটি সরানো শেষ হয়, তখন তিনি রত্নাকরের নাম ধরে ডাকেন |

রত্নাকরও কঠিন তপস্যার পর অবশেষে নিজের চোখ খোলে | কিন্তু আগের রত্নাকর সাথে যে এখনকার রত্নাকরের অনেক পার্থক্য, সেটা নারদ বুঝতে পারেন | কারণ তাঁর চোখ এবং শান্ত স্বভাবই তাঁর সেই নতুন দীপ্তময় চরিত্রের বর্ণনা দিচ্ছিলো |

এরপর রত্নাকর নারদমুনিকে প্রনাম করলো আর নারদমুনিও তাঁকে প্রেমপূর্বক মাটি থেকে তুললেন এবং জড়িয়ে ধরলেন |

তিনি এবার রত্নাকরকে বললেন; যেহেতু তাঁর “বাল্মীকা” অর্থাৎ পিপড়ের ঢিবি থেকে পুণরায় জন্ম হয়েছে তাই তাঁর নাম আজ থেকে সমগ্র ত্রিলোকে “মহর্ষি বাল্মীকি” হিসাবেই পরিচিতি পাবে এবং সে এবার থেকে হয়ে উঠবে অন্যের জীবনের পথপদর্শক |

এইভাবেই বর্তমানে; দস্যু রত্নাকরকে আমরা সবাই আজ মহর্ষি বাল্মীকি নামে চিনি | আমি আগেও বলেছিলাম যে, রামায়ণ কাব্যের রচয়িতা ছিলেন মহর্ষি বাল্মীকি নিজেই | বিশ্বের প্রথম মহাকাব্য লিখে তিনি আজ আদিকবি হিসাবে মান্যতা পেয়েছেন |

রামায়ন হলো একটি এমন কাব্য, যা ভগবান শ্রী রামের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে তৈরী | যা বাল্মীকি, কবিতার আকারে মানুষের কাছে তুলে ধরেছিলেন |

কথিত আছে রাম যখন সীতাকে ত্যাগ করেছিলেন সেইসময় তিনি গর্ভবতী অবস্থায় ছিলেন | মহর্ষি বাল্মীকি পরে তাঁকে নিজের আশ্রমে আশ্রয় দেন | আশ্রমে থাকাকালীনই সীতা দুই জমজ সন্তানকে জন্ম দেন | যাদের দুজনের নাম হলো যথাক্রমে লব ও কুশ |

বন্ধু, এই ছিলো মহর্ষি বাল্মীকির জীবন সম্বন্ধীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং তাঁর রত্নাকর থেকে মহর্ষি বাল্মীকি হয়ে ওঠার আসল গল্প | এই মহান মানুষটার মৃত্যু ঠিক কত বছর বয়সে হয়েছিল, সেই সম্বন্ধে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না | আশা করা যেতে পারে যে, তিনি শতবর্ষের বেশি সময় পর্যন্তই বেঁচে ছিলেন |

আরো পড়ুন: সন্দীপ মহেশ্বরীর জীবনী

এবার সবশেষে জানা যাক কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টস, মহর্ষি বাল্মীকির সম্বন্ধে, যা তোমার অবশ্যই জেনে রাখা উচিত |

Facts About Maharishi Valmiki:

1. মহর্ষি বাল্মীকি যেই রামায়ণ লিখেছিলেন, সেটা সম্পূর্ণ সংস্কৃত ভাষায় ছিলো | আর সেটা কিন্তু গল্পের আকারে মোটেই লেখা ছিলো না, সেটা সম্পূর্ণ ছিলো কবিতার আকারে লেখা |

2. বাল্মীকির রচিত “রামায়ণই” হলো পৃথিবীর প্রথম লেখা কোনো সংস্কৃত কবিতা, যা আদিকাব্য (First Poem) নামেও পরিচিত |

3. মহর্ষি বাল্মীকিকে আদিকবি (First Poet) বলা হয়ে থাকে |

4. “বাল্মীকা” এর সংস্কৃত নামের বাংলা অর্থ হলো পিপড়ের ঢিবি | মহর্ষি নারদমুনির সৌজন্যে দস্যু রত্নাকর, এই “বাল্মীকা” নামের থেকেই “বাল্মীকি” নামটা পেয়েছিলেন |

5. মহর্ষি বাল্মীকি ও ভগবান রাম সমসাময়িক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন | আর হিন্দু পুরান অনুসারে সেই যুগ ছিলো “ত্রেতা যুগ” নামে পরিচিত |

6. মহর্ষি বাল্মীকিকে সংস্কৃত শ্লোকের জনক বলা হয়ে থাকে | তাঁর বলা প্রথম শ্লোক হলো:

“मा निषाद प्रतिष्ठां त्वमगमः शाश्वतीः समाः।”
“यत्क्रौंचमिथुनादेकम् अवधीः काममोहितम्॥”
mā niṣāda pratiṣṭhāṁ tvamagamaḥ śāśvatīḥ samāḥ
yat krauñcamithunādekam avadhīḥ kāmamohitam


আশা করি তুমি “Maharishi Valmiki Biography in Bengali”  পড়ে নিশ্চই অনেক কিছু সুন্দর তথ্য সম্পর্কে জানতে পেরেছো | পোস্টটা ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই একটু Comment করে তোমার মতামত আমায় জানিও | তোমার মূল্যবান মতামত আমাকে বাড়তি অনুপ্রেরণা যোগাতে  ভীষনভাবে সাহায্য করে | 

About the author

admin

Hi Readers I’m Bebeto Raha, a Professional Youtuber & a blogger from Kolkata. My hobby is Playing Guitar, Making Youtube Videos, Watching Films. Also I love to read any kinds of knowledgeable book written by any good author.

View all posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *