পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথে | Satopanth Tal Trek

পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথে | Satopanth Tal Trek

পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথে
Satopanth Tal Trek Story

(লেখক: সম্রাট মান্না)


বহু যুগ আগে রচিত মহাভারতে গাড়োয়াল হিমালয়ের অন্তর্গত এ পথের বর্ণনা পাওয়া যায় এবং মানুষ বিশ্বাস করেন এই পথেই পান্ডবগণ অন্তিম যাত্রা করেন।

এ পথে বহু মানুষ আসেন তীর্থের উদ্দেশ্যে, কিন্তু কিছু মানুষ হয়তো আসেন প্রকৃতির ডাকে, পাহাড়ের রূপের গুণে । আমি কিন্তু এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির ।

সত্যি বলতে কি, পাহাড়ে যাই পাহাড়ের টানে । মহাভারত ছাড়াও এ পথের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায় উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের লেখায়।

রাস্তার প্রতিটি বাঁকে মিলে যায় উমাপ্রসাদ বর্ণিত জায়গাগুলো । যাই হোক, পথ চলার অভিজ্ঞতাটা প্রথম থেকেই শুরু করি।

আমরা ২১ শে মে, ২০১৮, কুম্ভ এক্সপ্রেসে (১২৩৬৯) হাওড়া থেকে ৫ জনের দল যাত্রা শুরু করি, গন্তব্য হরিদ্বার ।

যদিও কুম্ভ এক্সপ্রেসের ‘সুপারফাস্ট’-এর তকমা আছে তবুও হাওড়া থেকে ছাড়ল প্রায় তিন ঘন্টা দেরিতে; এটা হয়তো আমাদের দেশে খুব একটা বড় সমস্যা নয়, কিন্তু যখন হরিদ্বার পৌঁছলাম দেরিটা হয়ে দাঁড়াল আট ঘণ্টা পাঁচ মিনিটে ।

এতেও দেশের হয়তো বিরাট কিছু ক্ষতি হয়নি তবে আমাদের বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছিল । ট্রেনটা পৌঁছনোর সময় ছিল ২৩ শে মে, বিকাল ৪ টা ৪০ মিনিটে এবং আমাদের পরিকল্পনা ছিল হৃষিকেশের একটা হোটেলে গিয়ে ট্রেনের ধকল কাটিয়ে পরের দিন ভোরে বাস ধরে বদ্রিনাথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার ।

কিন্তু ২৪ শে মে, রাত ১২ টা ৪৫ মিনিটে হরিদ্বার পৌঁছে হোটেলে গিয়ে বিশ্রামের আশা ত্যাগ করতে হল ।

ঘন্টা তিনেক স্টেশনেই কাটিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে চা-টা খেয়ে বেরোলাম বাসের খোঁজে । ভরপুর মরসুমে বাসের সিট পেতেও নাস্তানাবুদ অবস্থা, শেয়ার গাড়িও তথৈবচ ।

তিন-চারটে বাস খোঁজার পর ভোর সাড়ে ৪টের সময় কোনোক্রমে বাস মিলল ।

ব্যাগপত্র বাসের ডিকিতে তুলে দিয়ে সিটে বসলাম যারফলে একটু মানসিক শান্তি মিলল । গন্তব্য বদ্রিনাথ, দূরত্ব প্রায় ৩২০ কিলোমিটার।

ঘন্টা খানেকের মধ্যে প্রবেশ করলাম পাহাড়ি রাস্তায় । একদিকে পাহাড় ও অন্যদিকে গঙ্গা, ভোরের পাহাড়ের এক অপূর্ব রূপ। বাস থেকেই মিলল ২৪ তারিখের সূর্যোদয় ।

পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথে | Satopanth Tal Trek

এক এক করে দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, বিষ্ণুপ্রয়াগ অতিক্রম করতে করতে ক্রমশ অলকানন্দার গা বেয়ে পৌঁছে গেলাম বদ্রিনাথ ।

মাঝে মধ্যে শুধু একটু যাত্রাবিরতি ও পেটপুজো চলেছিল । তবে যোশীমঠের পর জ্যামের জন্য বেশ বিরক্তিও লেগেছিল ।

বাসে আমরা ৫ জন ছাড়া একদল তীর্থযাত্রী ছিলেন যাঁরা পুরো রাস্তা শুধুমাত্র কৃষ্ণ, হরি এবং রামের গুণকীর্তন করতে করতেই কাটিয়ে দিলেন।

ঘড়িতে রাত ৮ টা, প্রায় ১৫ ঘন্টা পর পৌঁছলাম বদ্রিনাথ, সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১০,৮৫০ ফুট উচ্চতায় । তাই বাস থেকে নামতেই ঠান্ডার একটা শিরশিরানি অনুভব করলাম ।

আমাদের আগে থেকেই গাইডের সঙ্গে যোগাযোগ করা ছিল । গাইড কুঁয়ার সিং বিস্ট আমাদের পূর্ব পরিচিত এবং খুবই বিশ্বস্ত । আমরা বদ্রিনাথ পৌঁছতেই দলবল নিয়ে হাজির ।

যখন হোটেলে পৌঁছলাম, শরীর ভীষণ ক্লান্ত এবং অবসন্ন । গত দুই রাত ঘুম হয়নি, ট্রেনের ধকলের সঙ্গে বাসের ধকল শরীরকে ম্লান করে তুলেছিল।

ঠান্ডাটা যথেষ্টই, তাই স্নান করার ইচ্ছা হলেও ভরসা পাচ্ছিলাম না। কিন্তু গাইড কুঁয়ার সিং জি-র তত্ত্বাবধানে হোটেলে কিছুটা গরম জল মিলে গেল ।

বদ্রিনাথে উষ্ণ প্রসবন আছে, কিন্তু তা সন্ধ্যা ৭ টায় বন্ধ হয়ে যায় । তবুও কুঁয়ারের কারসাজিতে রাত ৮ টার পরও সেখান থেকেই সে গরম জলের ব্যবস্থা করে দেয়।

ধন্য আমাদের গাইড ! ভালো করে স্নান করে খাওয়া-দাওয়া করতে একটু বল পেলাম।

আমাদের এই ট্রেকে পাঁচদিন মোট সময় ধার্য ছিল এবং পথ চলা শুরু হবার কথা ২৫ তারিখে । কিন্তু ধকল সামলানোর জন্য একদিন বিশ্রাম নেব ঠিক করলাম, বাধ সাধলেন গাইড কুঁয়ার ।

তাঁকে ৩০ তারিখ রাতের মধ্যে ‘ওয়ান’ পৌঁছতেই হবে, অন্য দল অপেক্ষা করবে রূপকুন্ডের পথে যাত্রার জন্য ।

অর্থাৎ, ২৯ শে আমাদের ট্রেক শেষ করতে হবে। হয়তো চার দিনে অনেকেই সতপন্থ ঘুরে এসেছেন কিন্তু আমরা তো শুধুই হাঁটতে আসিনি, দেখাটাই আসল উদ্দেশ্য ।

আলোচনায় দাঁড়ালো এই যে, আমরা পরের দিন অর্থাৎ ২৫ শে মে যাত্রা শুরু করব এবং বরাদ্দ পাঁচ দিনই ট্রেক ও পাহাড় সৌন্দর্য উপভোগ করব । আর কথা নয়, রাত ১০ টায় এবার বিছানায় ।

২৫ শে মে, ২০১৮, ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সকাল সাড়ে ৭ টা, শরীরের জড়তা তখনও কাটেনি । সাধারণতঃ এ পথে যাঁরা ট্রেকে যান বেশিরভাগ মানুষই সকালে মন্দির পরিক্রমা করে বদ্রীবিশালকে প্রণাম করে যাত্রা শুরু করেন ।

কিন্তু ভরপুর মরসুমের ভিড়, পাশাপাশি আমাদের শারীরিক দুর্বলতার কারণে মন্দির পরিক্রমা সম্ভব হয়নি। তবে সকালের বদ্রিনাথ মোটেই শান্ত নয়, বরং একটু বেশিই চঞ্চল।

চারিদিকে উৎসব উৎসব রব, মানুষ একটু পুণ্যের খোঁজে, অন্তত এক থেকে দেড় কিলোমিটার সারিবদ্ধ । অলকানন্দার তীর, উষ্ণ প্রস্রবণ নারদ কুন্ড, মানুষের পুণ্যস্নানের ভিড়ে অস্থির ।

পবিত্র অলকানন্দা পুণ্যস্নানের আবর্জনা বয়ে নিয়ে চলেছে। এখান থেকেই বোধহয় শুরু প্রকৃতির বুকে পাপ ধুয়ে পুণ্যার্জন ।

পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথে | Satopanth Tal Trek

বদ্রিনাথ মন্দিরের পিছন দিকের পাহাড়ে কিছু অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল । কৃত্রিমভাবে পাহাড়ের গায়ে কিছুটা দূরত্ব বরাবর সামান্য উঁচু ঢিবি তৈরি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের কাছে খবর নিয়ে জানলাম, শীতের সময় বরফ পড়তে শুরু করলে যাতে মন্দিরের কোনো ক্ষতি না হয় তাই ওই ব্যবস্থা।

বরফ পড়তে শুরু হলে বা পাহাড় থেকে বরফের চাঁই গড়িয়ে এলে ঐ ঢিবিগুলোতে আটকে যায়, সহজে মন্দিরে এসে আছাড় খায় না ফলে মন্দির সুরক্ষিত থাকে । প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করতে মানুষের পটুত্বের একটি ছোট্ট নিদর্শন ।

নিজেদের তৈরি হয়ে বেরোতে বেরোতে সকাল সাড়ে ৯টা । গাইড কুঁয়ার; পাঁচজন পোর্টার, রেশন, তাঁবু ইত্যাদি নিয়ে একদম তৈরি । সবমিলিয়ে আমরা মোট ১১ জন ।

আমরা গাড়ি করে রওনা দিলাম ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’-র উদ্দেশ্যে । এখান থেকেই শুরু হবে আমাদের হেঁটে ভ্রমণ । মানা, বদ্রিনাথ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বে ।

অলকানন্দার ওপর দিয়ে লোহার সেতু অতিক্রম করে আমাদের গাড়ি দাঁড়ালো । আমাদের বাঁ দিকে নারায়ণ পর্বত, ডানদিকে নিচে তীব্র বেগে অলকানন্দা, আর নদীর ওপারে নরপর্বত ।

গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম অসীম আনন্দে । এখানে একটা কথা বলে নেওয়া দরকার, আমরা ‘মানা’ গ্রাম ঘুরে দেখি ট্রেকের শেষে, ফিরে এসে; কিন্তু ‘সতপন্থ’ বা ‘স্বর্গারোহন’ বর্ণনার পর ‘মানা’ সম্পর্কে লিখতে বসলে পাঠকদের রসভঙ্গ হতে পারে । সেই ভেবেই ‘মানা’ সম্পর্কে কিছু কথা এখানেই বলি ।

আগেই বললাম, ‘মানা’ ভারতের শেষ গ্রাম । এখানে প্রচুর ভ্রমনার্থী আসার জন্য এখানকার মানুষ সাধারণত পণ্য বিক্রয়কেই জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করেছেন; পাশাপাশি, হোটেল, চা-টিফিনের দোকানও বেশ চোখে পড়ার মতো।

‘মানা’ গ্রাম হলেও ঘন জনবসতি, জলনিকাশি ব্যবস্থা, ঘিঞ্জি অলিগলি যেকোনো ছোট শৈলশহরকেই মনে করিয়ে দেয়। ‘মানা’-র ওপর দিয়ে আরও এগিয়ে গেলে পৌঁছনো যাবে ‘মানা পাস’।

এরপরই তিব্বতের শুরু, তাই সাধারণ মানুষ, ভ্রমনার্থীর পাশাপাশি ভারতীয় সৈন্যদের আনাগোনা মুহুর্মুহু চোখে পড়ে।

‘মানা’-তেই অলকানন্দার সঙ্গে মিলিত হয়েছে সরস্বতী নদী। তবে শুধু নদী নয়, মিলিত হয়েছে দুটি রঙও; অলকানন্দার জল ঘোলা, সরস্বতীর সবুজ যার মিলনস্থল ‘কেশব প্রয়াগ’ নামেও পরিচিত ।

সরস্বতী নদীর ভয়াবহ গর্জন বেশ উপভোগ করার মতো। কথিত আছে, পান্ডবদের অন্তিম যাত্রাপথের উপরেই এই সরস্বতী নদী পড়ে এবং এর ভয়াবহতা পান্ডবগণের মনে আশঙ্কার সৃষ্টি করে, তখন মধ্যম পান্ডব ভীম একটিমাত্র পাথরের সাহায্যে সেতু নির্মাণ করেন, যা ‘ভীমপুল’ নামে আজও তার সাক্ষ বহন করে চলেছে ।

মানা গ্রাম থেকে বসুধারা জলপ্রপাতের চড়াই রাস্তার ওপরই আছে এই পুল। এই পুলের উপর দিয়েই পান্ডবগণ স্বর্গের পথে এগিয়ে যান। এই পথে অ্যাডভেঞ্চারের আশায় অনেক ভ্রমণার্থী বসুধারা জলপ্রপাত দেখতে যান।

এই ‘মানা’ গ্রামের একদম শেষপ্রান্তে মহাভারতের রচয়িতা ব্যাসদেবের গুহা দেখতে পাওয়া যায়, যা ‘ব্যাসগুফা’ নামে পরিচিত।

এখান থেকেই ব্যাসদেব পুরো কাব্য শুধুমাত্র পাঠ করেন এবং ঠিক ১০০ মিটার দূরত্বে বসে সিদ্ধিদাতা গনেশ তাঁর গুহা যা ‘গনেশ গুফা’  নামে পরিচিত, কাব্যের লেখনী রূপ প্রদান করেন।

ব্যাসদেব তাঁর ব্যাসগুফাতেই নাকি বেদকে চার ভাগে ভাগ করেন, তাই তাঁর নাম হয় ‘বেদব্যাস’।

প্রাচীন মুনি-ঋষিদের অদ্ভুত নানারকম ক্ষমতা থাকত তা আমরা অনেক শুনেছি বটে, কিন্তু সরস্বতী নদীর গর্জন উপেক্ষা করে ১০০ মিটার দূরে বসে কাব্য আবৃত্তি করে সিদ্ধিদাতার কর্ণপটহে পৌঁছে দিতে ব্যাসদেবকে যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই (জানি না দুজনে পাশাপাশি বসেছিলেন কিনা)।

এবার ফিরি হাঁটার ছন্দে, আমাদের আজকের গন্তব্য ‘লক্ষ্মীবন’ । আমরা হাঁটতে শুরু করলাম অলকানন্দার বাম দিক দিয়ে । ‘মানা’ সভ্যতা কিন্তু অলকানন্দার ডান দিকে।

মানা থেকে লক্ষ্মীবনের দূরত্ব কমবেশি ৯ কিলোমিটার । চারিদিকে গমের ক্ষেত, তার চারপাশ পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ।

দুই দিকে একটানা পাঁচিলের মধ্যে দিয়ে সরু পথ । লাইন দিয়ে, প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ফ্রেমবন্দি করতে করতে যেন গ্রামের কোনো গলি দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি ।

কিছুটা দূরত্ব এগোনোর পর দেখতে পেলাম একটি ছোট মন্দির। অলকানন্দার বামতীরে নির্জন স্থানে রয়েছে এই মাতা মূর্তির মন্দিরটি ।

পুরাণ মতে ইনি ছিলেন দুই পর্বত ভ্রাতা নর ও নারায়ণের জননী । ‘নর’ ও ‘নারায়ন’ এই দুই ভাই তপস্যার জন্য নাকি গৃহত্যাগী হন । প্রচন্ড উদ্বেগে মাতা যখন তাঁদের খুঁজতে আসেন, তাঁকে দেখে গৃহত্যাগী দুই ভাই দুটি পর্বত হয়ে স্থানু হয়ে যান ।

তখন মাতার দুঃখ দেখে এই স্থানে ঋষি নারায়ণ, মাতার বসবাসের সম্মতি দেন । সেই থেকেই একা মাতা এই নির্জন মন্দিরে অধিষ্ঠান করেন ।

আরও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে গিয়েছে। শুরু হয়েছে পাহাড়ি রাস্তার চড়াই-উৎরাই খেলা । একটা বাঁক ঘোরার পর ডানদিকে অলকানন্দার অপর দিকে অনেক দূরে চোখে পড়ল বসুধারা জলপ্রপাত ।

বামদিকে পাহাড়, ডানে নীচে, অনেক নীচে বয়ে চলেছে অলকানন্দা । পাহাড়ের প্রান্ত দিয়ে আমরা অতিক্রম করলাম খানিকটা উৎরাই । কিছুটা দূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরু হল পাথুরে চড়াই রাস্তা । ঝুরঝুরে বালিমাটি আর ছোট-বড় পাথরে ভর্তি সেই রাস্তা ।

গাইডের কথামত ধীরে ধীরে সন্তর্পণে সারিবদ্ধভাবে এগোতে লাগলাম, এরই মধ্যে বিভিন্ন পাহাড়ি পাখির কলকাকলি পরিবেশের আলাদা সৌন্দর্য এনে দিয়েছে । একটু দূর থেকেই চোখে পড়ল অলকানন্দার ওপর বিশাল আকারের হিমবাহ, ঠিক যেন বরফের পুল ।

শক্ত, মোটা বরফের আস্তরণের নীচ দিয়ে দুর্বার গতিতে সিংহ গর্জনে বেরিয়ে আসছে খরস্রোতা অলকানন্দা ।

আস্তে আস্তে এগোতে লাগলাম হিমবাহের দিকে। অপূর্ব দৃশ্য, নারায়ন পর্বত থেকে বরফের বিশাল আস্তরণ অলকানন্দায় মিশেছে, এ হল ‘ধান্য হিমবাহ’ ।

পান্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথে | Satopanth Tal Trek

এই আস্তরণ বহু প্রাচীন । বরফের মধ্যে মধ্যে উঁকি দিচ্ছে বিশাল আকারের পাথর । কত যুগ ধরে যে এই বরফ আর পাথর তাদের আস্তরণ সৃষ্টি করেছে, কে জানে !

হিমবাহের পুরো অংশটাই শক্ত নয়, মাঝে মাঝে ঝুরঝুরে বালিমাটির সঙ্গে বরফ গলে মিশে কাদা, আবার কোথাও কোথাও ফাটলও তৈরি হয়েছে ।

এরই মধ্যে আমাদের গাইড দক্ষ পায়ে অতিক্রম করালেন ধান্য হিমবাহ । তারপর বেশ কিছুটা চড়াই উঠতেই চমক । বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, মধ্যে মধ্যে ছোট ছোট ঝোপ – ‘চামতোলি বুগিয়াল’ যা ঘাসতোলি বলেও পরিচিত।

বেশ কিছুক্ষণ পাথুরে রাস্তা, তারপর হিমবাহ অতিক্রমের পর এরকম সবুজ পরিবেশ মনটা অসম্ভব ভালো করে দেয় ।

বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ সেখানে | এই হল পাহাড়ের সৌন্দর্য; প্রতিটি বাঁকে দৃশ্যপটের বদল, প্রতিটি বাঁকে নতুন কিছু পাওয়া; এ পাওয়ার কোনো শেষ নেই। সকালের শারীরিক দুর্বলতা এ পাওয়ার কাছে নিমেষে ম্লান হয়ে গেল।

আমাদের ডান দিকে বয়ে চলা অলকানন্দার ঠিক ওপারে প্রকট রূপে বসুধারা জলপ্রপাত; শোনা যায়, সেটি হচ্ছে অষ্ট বসুর তপস্যা ক্ষেত্র।

জলপ্রপাতের নীচে বরফের উঁচু ঢিবি। দূর থেকে বেশ ছোট মনে হলেও ক্যামেরার সাহায্যে দেখতে পেলাম অন্তত ইটভাটার স্তূপকার মাটির আকার তো হবেই ।

প্রচন্ড হওয়ার বেগে জলপ্রপাতের সব জল নিচ পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে না । ধোঁয়ার আকারে বিলীন হচ্ছে বাতাসে ।

হাঁ করে দেখলাম কিছুক্ষণ, জলপ্রপাতে কিছু ভ্রমণার্থীও চোখে পড়ল । বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর মুখে একটা করে টফি ফেলে আবার হাঁটতে শুরু করলাম ।

এখন অনেকটা অংশই সবুজ, হাঁটার গতিটা একটু বেশি । তবে বেশিদূর যেতে হল না, আবার রুক্ষতা শুরু, গতি শ্লথ ।

বেলা তিনটে নাগাদ পৌঁছলাম সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১২,০০০ ফুট উচ্চতায়, ‘লক্ষ্মীবন’ । এখানে অলকানন্দার গতি খুব ধীর, জলও কম । বেশ বোঝা যাচ্ছে হিমবাহের নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় জলের পরিমাণ বেড়েছে । লক্ষ্মীদেবী নাকি এই লক্ষ্মীবনেই তপস্যা করেছিলেন ।

তা বটে, এমন জায়গায় তপস্যা করেও সুখ । এখানে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেই চির অশান্ত মন যথেষ্ট শান্তি লাভ করবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

লক্ষ্মীবনের চারিদিক পাহাড়ে ঘেরা, নিস্তব্ধ এক সমতল সবুজ ক্ষেত্র যার প্রায় পুরোটাই রঙ বেরঙ-এর ছোট ছোট ফুল, মধ্যে মধ্যে ঘাসের ঝোপ; রুক্ষতার মাঝে যেন প্রকৃতির প্রাণ ।

এরই মধ্যে পাখির কচকচানি সৌন্দর্যের উপরি পাওনা। লক্ষ্মীবনের একদিক ঢালু হয়ে অলকানন্দায় মিশেছে । ওই ঢালে রয়েছে প্রচুর ভূর্জ গাছ। গুল্ম চরিত্রের এই গাছ গুলোর আকার পরিণত আম গাছের মতো, কিন্তু কান্ডের ধর্ম পেয়ারার সাথে মিলে যায়; অর্থাৎ, বাকল মোচনেই রেচন ত্যাগ ।

খয়েরি ছাল খুলে খুলে আছে, যেটি হল বিখ্যাত ভূর্জপত্র | যাতে পুরাকালে লেখা হতো, পুঁথির পর পুঁথি তৈরি হত ।

শরীর বেশ ক্লান্ত ছিল, নীচে গিয়ে কিছু ভূর্জপত্র হেফাজতে নেওয়ার ইচ্ছা হলেও চরণযুগল একেবারেই নারাজ । আমাদের পোর্টার কাম কুক মিস্টার গব্বর সিং-এর তৈরি সুপ খেয়ে একটু বল পেলাম বটে, কিন্তু চরনযুগলের সম্মতি মিলল না ।

বেশ বুঝতে পারছি সকালের শারীরিক দুর্বলতা কিছুটা হলেও আবার একটু চাগাড় দিয়েছে । নিজেদের মধ্যে একটু সান্ধ্য আড্ডা দিয়ে তাঁবুর ভিতর আশ্রয় নিলাম ।

রাত ৯ টা নাগাদ ডাক এলো ডিনারের । গব্বরজির গরম গরম সুস্বাদু খিচুড়ি খেয়ে আমার পরম ভালোবাসাকে কাছে টেনে নিলাম। প্রিয়তম আঁখি দুটিকে আর কষ্ট দিয়ে লাভ কি !

২৬ শে মে, ২০১৮, সকাল ৬ টা; ঘুমটা আচমকাই ভেঙে গেল । গ্রুপের বাকি সদস্যরাও উঠে পড়েছেন । Sleeping bag থেকে বেরিয়ে, তাঁবুর বাইরে এলাম |

সকালের লক্ষ্মীবন অপরূপ, অপূর্ব তার শোভা । তাপমাত্রা বদ্রিনাথের থেকে কম থাকলেও বেশ সহনীয় ছিল । পোর্টাররা যে যাঁর কাজে মগ্ন, সুপ্রভাত জানালেন প্রত্যেকে।

নিজেদের কাজ কিভাবে ব্যস্ততার সঙ্গে করতে হয়, ভ্রমণার্থীদের কিভাবে আপ্যায়ন করতে হয়, পাহাড়ের মানুষের কাছে বার বার শিখতে পারি; পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি পাহাড়ের মানুষগুলোও বড্ড আপন, পাহাড়ের কোলে বার বার ছুটে যাওয়ার বোধহয় এটাও একটা কারণ ।

সকাল সাড়ে ৮ টা, রুটি-তরকারি খেয়ে হাঁটা শুরু । আজ আমাদের যেতে হবে কমবেশি ৮ কিলোমিটার । সামনে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুমাত্র বোল্ডার, ছোট-বড় পাথরে ভর্তি । কোন কোনটা নড়বড়ে ।

আগের দিনই শুনেছিলাম এরপর রাস্তা বেশ বিপদসঙ্কুল, তবে এ রাস্তায় কিছু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও হয়েছে । দু কিলোমিটার মত অতিক্রম করার পর ছোট-বড় পাহাড়ে ঘেরা বেশ কিছুটা সমতলে প্রবেশ করলাম, – ‘বান ধার’।

এখানে পাথর ঘেরা প্রকৃতিসৃষ্ট কয়েকটি গুহাও চোখে পড়ল। এর মধ্যে একটি আকারে কিছুটা বড়, কৃত্রিমভাবে এর দরজাও লাগানো হয়েছে।

হঠাৎ কোনো বিপদে, বা সঙ্গে তাঁবু না থাকলেও এখানে আরামেই রাত্রিযাপন সম্ভব হবে। আশেপাশে কলকলে ঝর্ণা, মাঝে মাঝে পাহাড়ি পাখির কাকলি এ জায়গাটার সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে।

আর একটু এগোতেই দেখতে পেলাম একটি পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে অবস্থিত একটি বিশাল পাথর; গাইডের কথা অনুযায়ী ওটা নাকি ‘ভীমের গদা’।

এটা যদি ভীমের গদা হয়, ভীমের আকার অন্ততঃ একটি ছোটখাট পর্বতের মত হবেই। কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম না ভীম ঐ স্থানে গদাটা রেখে গেলেন কেন !

এরপর রাস্তা বেশ চড়াই। আমরা এতক্ষণ অলকানন্দাকে ডানে রেখে এগিয়েছি। এবার আমাদের যেতে হবে নীলকণ্ঠ পর্বতকে বাঁ দিকে রেখে অর্ধ পরিক্রমা করে সতপন্থ হিমবাহ ধরে ।

রাস্তা ক্রমশ বাম দিকে বাঁক নিয়েছে । বাঁকের কাছে অন্য আরেকটি হিমবাহ এসে সতপন্থ-র হিমবাহে মিশেছে – ‘ভগীরথ খড়্গ’ । এই দুই হিমবাহ (সতপন্থ ও ভগীরথ খড়্গ)-এর সঙ্গম তৈরি করেছে একটি নদী উপত্যকা – ‘অলকাপুরী’ ।

কুবেরের অক্ষয় সুখ সম্পদ সঞ্চিত, বিরহী যক্ষের চোখের জলে ভরা অলকাপুরী । এই অলকাপুরী থেকেই অলকানন্দার উৎপত্তি বলা হয় ।

দাঁড়ালাম সেখানে কিছুক্ষণ | শোনা যায়, এই ভগীরথ খড়্গ হিমবাহ ধরে গেলে পাঁচ থেকে ছয় দিনে গোমুখ পৌঁছানো যায়।

যত সামনের দিকে এগোচ্ছি শুনতে পাচ্ছি প্রচন্ড বেগে পড়া জলের শব্দ । সামনে একটা ছোট চড়াই অতিক্রম করতেই বুঝলাম আসল কারণটা । নীলকণ্ঠ পর্বতের গা বেয়ে নেমে এসেছে অজস্র ঝর্ণা – ‘সহস্রধারা’।

সামনে যতদূর দৃষ্টি যায়, বামের পর্বতশৃঙ্খলে শুধু জলধারা । মহাভারত অনুযায়ী, পঞ্চপান্ডবের অন্তিম যাত্রাকালে বানের আঘাতে অর্জুন সৃষ্টি করেছিলেন এই সহস্রধারা ।

সময়টা বর্ষা না হলেও জলরাশির খামতি নেই, তবে বর্ষায় এর ভয়াবহতা যে মারাত্মক তা বেশ টের পেলাম । মনে মনে বর্ষার সময়ে এ স্থানের ভয়াবহ সৌন্দর্য উপভোগ করার একটা বাসনা তৈরী হল।

যাই হোক, এই জলপ্রপাতের মধ্যে পাঁচটা বেশ বড় জলপ্রপাত । পুরাণ মতে (উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বর্ণিত) এই পাঁচটা জলপ্রপাতকে একত্রে ‘পঞ্চধারা তীর্থ’ বলা হয়ে থাকে । এরা ‘প্রভাস’, ‘পুষ্কর’, ‘গয়া’, ‘নৈমিষ’ ও ‘কুরুক্ষেত্র’ নামে খ্যাত।

ভগবানের আদেশে নাকি পঞ্চতীর্থের দেবতারা এখানে তপস্যা করেন। আমরা এগিয়ে চললাম সহস্রধারাকে বামে রেখে।

কিছুটা এগিয়ে অল্প চড়াই পেরোতে শুরু হলো শিরদাঁড়া পথ, যেন এক বিশাল পাঁচিলের উপর দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। একটা শুঁড়িপথ, দুই দিকে পাহাড়ের এবড়ো-খেবড়ো পাথরের ঢালু গা, নেমে গেছে অন্তত তিন চারশ ফুট নিচে ।

ডানদিকের বিশাল হিমবাহের অপর দিকে প্রকট রূপে ‘বালাকুন শৃঙ্গ’ । বাঁ দিকে নীচে বয়ে চলেছে সহস্রধারার জলধারা | অদ্ভুত রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা ।

আমাদের হাঁটার পথ ঝুরঝুরে বালিমাটি, নড়বড়ে পাথরে ভর্তি । নীচের দিকে তাকিয়ে ছাড়া হাঁটা যাচ্ছে না । পারিপার্শ্বিক দৃশ্য উপভোগ করতে গেলে বা ফ্রেমবন্দি করতে গেলে দাঁড়াতে হচ্ছে ।

আমাদের রাস্তার প্রায় কিলোমিটার দুয়েক যাওয়ার পর দেখতে পেলাম অনেক শিরা-উপশিরা নিয়ে প্রায় গোলাকার একটি সবুজক্ষেত্র, যেন কোনো শিশু তার অনিপুণ হাতে সবুজ চিত্রপটে আঁকি-বুকি খেলেছে ।

একটা উৎরাই, নামতে থাকলাম। শিশুর সবুজ চিত্রপটটা বেশ খানিকটা সমতলভুমির রূপ নিয়েছে; আর তার আঁকি-বুকি খেলাটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জলের ধারা । এই সমতলভুমি অতিক্রম করলেই সামনে অপেক্ষা করছে এক বিশাল চড়াই।

চড়াই অতিক্রম করতেই প্রবল একটা হওয়ার দাপট অনুভব করলাম হঠাৎ করেই যেন অনেকটা উপরে উঠে এসেছি।

চারিদিকে পর্বতশৃঙ্গগুলো বরফাবৃত |  রাস্তায় মধ্যে মধ্যে বরফের চাদর, তার নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে জলধারা ; শব্দ শুনতে পাচ্ছি, অথচ দেখতে পাচ্ছি না ।

আবার কখনও কখনও চাদরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে ক্ষীণ জলধারা । প্রত্যক্ষ করলাম প্রকৃতির সৃষ্টিকে, অনুভব করলাম তার রূপ-বৈচিত্র্যকে।

আরও কিছুদূর এগোতেই একটা বাঁক। বাঁক পেরোতেই চমক। চারিদিকে পাহাড় ঘেরা প্রায় গোলাকার সবুজ ঘাসে ঢাকা খেলার মাঠ – ‘চক্রতীর্থ’ ।

এরকম বোল্ডারে ভর্তি, রুক্ষ এলাকার মাঝে কে বানালো এটা ! যেন একদল দক্ষ শ্রমিক পাথরখন্ড গুলোকে চারিদিকে সরিয়ে দিয়ে এই মাঠটি নির্মাণ করেছেন । এখানেও মাঠের মাঝে অজস্র শিরা-উপশিরা মানচিত্র অঙ্কন করেছে । আমাদের পিছনে ‘বালাকুন’, বাঁয়ে ‘নীলকন্ঠ’, সামনের ডানে ‘চৌখাম্বা’।

একটা উৎরাই পেরিয়ে প্রবেশ করলাম আজকের গন্তব্যে । ঘড়িতে তখন দুপুর ২ টো । কথিত আছে, এখানেই নাকি প্রয়োজন ফুরিয়েছে বলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র গেঁথে রেখেছিলেন।

চক্রতীর্থে ক্যাম্প করার জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞতার দরকার আছে । এখানে সঠিক জায়গা নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ যখন-তখন পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে পাথরখন্ড, বরফখন্ড; আবার পোর্টারদের কাজের সুবিধার্থে আশেপাশে জলের উৎস থাকাটাও দরকার ।

আমাদের যেখানে camp হয়েছিল তার একটু দূরেই ছিল ঝর্ণা । নিস্তব্ধ এলাকায় একটানা ঝর্ণার মৃদু শব্দের সঙ্গে আচমকা Avalanche-এর গড়গড়ানি বেশ ভীতির সঞ্চার করে ।

এখানে একটা ঘটনা না উল্লেখ করলেই নয় যে, আমাদের পাহাড়ে চড়া বন্ধুদের অভিজ্ঞতা বর্ণনার একটি উল্লেখযোগ্য স্থান হল facebook-এর অনেক group-এর অন্যতম ‘Bengal in Trekking’

আমাদের এই যাত্রায় নেতৃত্বে ছিলেন এই Group-এরই Admin, পাশাপাশি আমার খুব কাছের দাদা কৌশিক ব্যানার্জী মহাশয় । চক্রতীর্থে এসে আকস্মিক আলাপ হল এই group-এরই অন্যতম admin শ্রীমতি বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ার সঙ্গেও ।

ওনারাও একই লক্ষ্যে এসেছেন ; পার্থক্য একটাই, আমরা সতপন্থ-এর অভিমুখে, ওনারা বিপরীতে। চক্রতীর্থে এই দুই admin এর সঙ্গে বিকেলের আড্ডা ভালোলাগার উপর আর একটি উপরি পাওনা ।

চক্রতীর্থ সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায় । ঠান্ডাটা একটু বেশিই । চারিদিক পাহাড়ে ঘেরা হলেও এ স্থানে হওয়ার বেগ ছিল প্রবল । তবে আশ্চর্য লেগেছে কিছুতেই বুঝতে পারলাম না হওয়ার দিক । সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি হল না। তবে পড়ন্ত রোদে নীলকণ্ঠের রূপ ভোলার নয় ।

সন্ধ্যের পর তাঁবুর বাইরে যথেষ্ট ঠান্ডা। হওয়ার তীব্রতা সোজা হাড়ে বিধঁছে। সুতরাং, তাঁবুর ভিতরেই গল্প-আড্ডা।

২৭ শে মে, ২০১৮, সকাল সাড়ে ৫ টা; সুপ্রভাত জানালো চক্রতীর্থ। ভোরের আলো তখনও ক্ষীণ। দলের বাকিরা ঘুমোচ্ছেন। তাঁবুর বাইরে এলাম, হাওয়ার বেগ বেশ তীব্র, ঘাস শিশিরভেজা এবং তাপমাত্রাও বেশ কম ।

তারই মধ্যে তিড়িং-বিড়িং করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে পাহাড়ি পাখি । পোর্টাররা প্রত্যেকে একই রকমভাবে ব্যস্ত । প্রাতঃকৃত্য সেরে এক গ্লাস চা নিয়ে বসলাম একটা পাথরের ওপর, উপভোগ করলাম ভোরের চক্রতীর্থকে । গতকাল প্রায় সারারাত (ঘুম ভাঙলেই) Avalanche-এর শব্দ পেয়েছি । গাইডের কথা অনুযায়ী বর্ষায় এই গড়গড়ানির পরিমাণ অনেক বেশি।

সকাল সাড়ে ৬ টা, আকাশ ঝকঝকে । মৃদু সূর্যালোক চৌখাম্বার গায়ে প্রতিফলিত নীলকন্ঠর ছায়া মাথার ওপর । নীল আকাশের প্রতিফলন ঝর্ণার জলে । আমাদের দলের প্রত্যেকেই উঠে পড়েছেন । সাজো সাজো ব্যাপারটা শুরু হয়ে গিয়েছে ।

আজ আমাদের গন্তব্য ‘সতপন্থ তাল’; দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার, তবে এ রাস্তায় শুনলাম সময়টা একটু বেশিই লাগবে। গাইড কুঁয়ারজি বললেন; আপনারা এগিয়ে যান, আমরা আসছি ।

খাওয়া-দাওয়া করে বেরোতে বেরোতে সাড়ে ৮ টা বেজে গেলো |

আগেই বলেছি চক্রতীর্থ চারিদিকে পাহাড় ঘেরা, সুতরাং আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে এক বিশাল চড়াই, উচ্চতা আন্দাজ ২০০ ফুট তো হবেই, এক বিরাট শায়িত প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপের ন্যায় উপস্থিত ।

হাঁকড়-পাঁকড় করে উঠতে থাকলাম | মিনিট ৪৫ পর সরীসৃপের পিঠের উপর পৌঁছলাম; ও বাবা ! এতো শুধু সরীসৃপের শিরদাঁড়া, কোনোমতে দুটো পা রাখার জায়গা ।

উল্টোদিকে প্রায় ১৫০ ফুটের খাড়াই উৎরাই । একটু বেতাল হলেই গড়িয়ে যাব তাই বসে পড়লাম । এখানে হাওয়ার বেগও মারাত্মক । চক্রতীর্থর দিকটা বেশ সবুজ ছিল, কিন্তু এ দিকটা রুক্ষ বোল্ডার ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না ।

দু-প্রান্তের পরিবেশের অদ্ভুত মেলবন্ধন এই দৈত্যাকার পাঁচিল । পিছন দিকে তাকালাম; অনেক নীচে চলে গেছে চক্রতীর্থ । আমাদের গাইড, পোর্টাররা সারিবদ্ধভাবে পিঁপড়ের ন্যায় এগিয়ে আসছেন ।

আরও পিছনে, অনেক পিছনে, দৃশ্যমান মোহময়ী অলকাপুরী; সাদা মেঘ, ধূসর পর্বতের গায়ে লেগে লেগে আছে । সূর্যের আলোয় মধ্যে মধ্যে পাহাড়ের গায়ের বরফ চিকচিক করে উঠছে । এক অপূর্ব মায়াময় দৃশ্য। কবির ‘মেঘদূত’-এর অলকাপুরীর বর্ণনা সার্থক।

এবার নামতে হবে; পুরোটাই ছোট-বড় নড়বড়ে বোল্ডার । লাঠির ওপর ভর দিয়ে ছোট ছোট পদক্ষেপে নামতে থাকলাম । এই রে ! রাস্তা কৈ, কিছুই তো বুঝতে পারছি না, এগোব কোনদিকে!

উপর থেকে কুঁয়ার জি-র আওয়াজ এল “আগে দেখিয়ে, পাত্থর কে উপর ছোটা ছোটা পাত্থর হ্যায়, উসকো ফলো কিজিয়ে”। সত্যই আমাদের গাইডের তুলনা নেই, যতই এগিয়ে যাই, চোখের আড়াল হতে দেবেন না।

গাইডের কথামত সামনে তাকালাম; তাই তো, প্রথমটা মনে হবে এখানে একা থাকলে দিকভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা মারাত্মক; কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ছোট ছোট পাথরখন্ড একের পর এক সাজানো, যেন শিশুর তৈরি পাথরের মন্দির ।

এরকম সাজানো এক চিহ্ন থেকে আগের চিহ্নে এগিয়ে যেতে হবে, রাস্তা ভুল হওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই । এগোতে শুরু করলাম আবার উঁচুনিচু পথে ।

এখানে নড়বড়ে পাথরের পরিমাণ এতই বেশি যে যেটাতেই পা দিই না কেন মনে হচ্ছে এই হড়কালো বুঝি । ঘাড় গুঁজে প্রায় লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চললাম । কিন্তু লাফানোর আগে নিশ্চিত করে নিতে হচ্ছে পাথরটার টলমলতা ।

বেতাল হলেই পাথরের খাঁজে কতদূর তলিয়ে যাব, কে জানে ! বেশ বুঝতে পারলাম এই ৫ কিলোমিটার অতিক্রম করতে যথেষ্ট সময় লাগবে।

মাঝে মাঝে দাঁড়াই, দৃশ্য উপভোগ করি, Avalanche-র শব্দ শুনি, কোথাও কোথাও পায়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলরাশির শব্দ শুনতে পাই; আবার লাফাতে শুরু করি ।

কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর চারিদিকের পরিবেশ এমনই, যে দিকে তাকাই একই রকম, মেঘলা পরিবেশে কোনো ব্যক্তিকে একবার চোখ বন্ধ করে একপাক ঘুরিয়ে দিলে দিকভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ |

এক্ষেত্রে একমাত্র উপায় চৌখাম্বা ও নীলকণ্ঠের অবস্থান; তবে আবহাওয়া কুয়াশাচ্ছন্ন হলে, হয় গাইডের হাত নয়তো বর্তমান প্রযুক্তির হাতমুঠোর কম্পাস; সেক্ষেত্রে অবশ্য প্রত্যেকটি স্থানের ভৌগলিক অবস্থান থাকতে হবে নখদর্পণে।

রাস্তা মোটামুটি চড়াই-উৎরাই মিশিয়ে। ডানদিকে Moraine; পাথরখন্ড, ঝুরঝুরে মাটি, জলরাশিতে কাদা মাটি মাখা, মাঝে মাঝে শক্ত পুরোনো বরফ, কোথাও কোথাও পাথরমধ্যে বরফ গলে দীঘির ন্যায় জলাশয়; কোনো কোনোটার রঙ নীলচে আবার কোনো কোনোটা ঘোলাটে ।

বামদিকে একত্র স্তূপকার পাথরের টিলা, হঠাৎ শুনতে পেলাম সেই গত রাত্রের আওয়াজ, চৌখাম্বা থেকে Avalanche নামছে, বেশ বড়ো আকারের বরফখন্ড ভেঙে গড়িয়ে পড়তে দেখলাম; একটা সাদা মেঘের কুন্ডলি, তারপরেই সব পরিষ্কার ।

বোল্ডারের উপর দিয়ে চলতে চলতে বেশ অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম । এ পাথর থেকে ও পাথরে ডিঙিয়ে চলার এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি, কেমন যেন নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়লাম । এই পথে এগিয়ে যাওয়ার এক অসীম কৌতুহল ক্রমশ মনের মধ্যে তৈরি হতে লাগলো ।

নিজে নিজে এগিয়ে যাওয়ার একটা প্রবল আকাঙ্খা; এও জানি পথভ্রষ্ট হলে কুঁয়ারজির হাঁক বাদ যাবে না । তাঁর দায়িত্ববোধ আমাদের মনে অনেক ভরসার সঞ্চার করেছিল ।

সাজানো পাথরের চিহ্ন দেখতে দেখতে একটা দারুণ জিনিস লক্ষ্য করলাম । চক্রতীর্থ থেকে কিছুটা এগিয়ে দৈত্যাকার পাঁচিল অতিক্রমের পর সতপন্থ যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই ।

অনেকদিন ধরে যাঁরা এদিকে এসেছেন প্রকৃতির অনুকূল অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বড় বড় পাথরের ওপর চিহ্ন সাজিয়েছেন; তবে সব পথই সমান্তরাল । আমরা যে পথে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদেরই সঙ্গে থাকা পোর্টাররা ডানদিকে বেশ কিছুটা নীচ দিয়ে যাচ্ছেন ।

একটু মনযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে দেখতে পেলাম ওনারাও আমাদেরই মতো চিহ্ন লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছেন । আবার একদল আমাদেরই মতো ভ্রমণার্থীদের বিপরীত দিকে আসতে দেখলাম, যাঁরা আমাদের বাম দিক দিয়ে বেশ কিছুটা উপর দিয়ে আসছেন, তাঁরাও কিন্তু কোনো না কোনো চিহ্ন লক্ষ্য করেই চলেছেন।

শুনেছি এ পথে যাঁরাই এসেছেন, মনের মধ্যে একঘেঁয়েমির অভিজ্ঞতা নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আমার এ পথ অসম্ভব ভালো লেগেছে। হয়তো শুধু পাথর, জলের শব্দ, জমাট বরফ, Moraine ছাড়া আর কিছুই নেই তবুও ঐ নড়বড়ে পাথরগুলো বেশ একটা অন্যরকম অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ দিয়েছে ।

এটা আমার বদ গুণ কিনা জানি না, প্রকৃতির সবকিছুই আমার ভালো লাগে । যখনই বেড়াতে যাই, কি দেখতে পাব তার হিসাবটা আগে থেকে করি না । এটা জানি, যাচ্ছি যখন কিছু নিশ্চয় নতুন দেখব বা পুরোনোকে নতুনভাবে পাব; সবটাই পাওয়া । তাই বোধহয় আত্মার অতৃপ্তি আজ পর্যন্ত ঘটেনি ।

পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে অনেককে বলতে শুনেছি, ‘দূর, সারাদিন শুধু বৃষ্টি হচ্ছে, কিছুই দেখতে পেলাম না’ বা ‘এই মেঘলা ওয়েদারে কেন যে এলাম!’ কিন্তু আমার বিশ্বাস প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি আবহাওয়ায় পাহাড়ের এক এক রূপ; এক এক রকমভাবে পাওয়া ।

সবটাই উপলব্ধি করার সুযোগ আমাদের আছে । যাক সে কথা, কতক্ষণ হাঁটা হল জানি না । লাফাতে লাফাতে বেশ তো চলেছি, কখন যে গাইড কুঁয়ার সিং আমার পিছনেই এসে পড়েছেন টেরও পাইনি, বুঝতে পারলাম গলার আওয়াজে, ‘আপকে আগে ক্যা হ্যায় ?’ যেখানে ছিলাম, সেখানেই দাঁড়িয়ে গেলাম; সামনে দেখি ঠিক আগের মতোই আর একটা দৈত্যাকার মৃত সরীসৃপ ।

আবার প্রশ্ন ছুটে এল, ‘মালুম হ্যায়, ইস পাহাড়কে উসপার আপকো ক্যায়া মিলেগা?’, কি জানি, ভুল করলাম কি কিছু! বেশ থতমত খেয়েই পাশাপাশি ঘাড় নাড়লাম ।

‘ধীরে চলিয়ে, পাহাড় কে টপমে যা কর আপনে আপকো সাম্ভাল নেহি পাওগে, ধীরে সে চলিয়ে ঔর উপর যা কর উস তরফ দেখিয়ে ।’

তাই করলাম |

আরিব্বাস! চোখের সামনে চকচক করছে ত্রিকোনাকার ‘সতপন্থ তাল’ । ‘সত’ অর্থাৎ সত্য (Truth), ‘পন্থ’ অর্থাৎ পথ (Path or Way) ‘সত্যের পথ’ । সত্যই আমাদের চলার পথ ‘সত্যের’ ‘স্বর্গের’ । আগে ছবিতে দেখেছিলাম, এখন সম্যক; ছবির মতোই সুন্দর । ওখানেই বসে পড়লাম, দেখি কিছুক্ষণ ভালো করে ।

কুঁয়ারজি ঠিকই বলেছেন, আচমকা দেখলে নিজেকে সামলাতে পারা কঠিন ।


ঘড়িতে ১১ টা ৪০, নামতে থাকলাম গন্তব্যে । পোর্টাররা এরই মধ্যে তাঁবু তৈরী করে দিয়েছেন । কিন্তু নিজেরা কোনো তাঁবু ফেলেননি ।

কারণটা জটিল কিছু নয়, সতপন্থ তালের তীরে আগে থেকেই নির্মিত চৌক বাক্স আকৃতির প্রায় ১২’/১২’ ঢালাই ঘর (হঠাৎ দেখলে পাতিহাঁসের বদ্ধ ফার্ম ভেবে ভুল হতে পারে)-এ থাকার ব্যবস্থা করেছেন । মোটামুটি ঢুকতে-বেরোতে হামাগুড়ির ব্যবস্থা ।

সতপন্থ তালের চারপাশই ঢালু; এরই মধ্যে তুলনামূলক সমতলে আমাদের ক্যাম্প । তবে এখানে যা অবস্থা; ভালোভাবে একটা দল, কোনোরকমে দুটি দল ক্যাম্প করতে পারবেন ।

তাই একটু ভিড়ের মরসুমে জায়গা ধরার জন্য যতটা আগে যাওয়া যায় ততই ভালো । এখানে রয়েছে ‘ভোলেবাবা’-র একটি পাথরের ছোট মন্দির, যার ভিতর অধিষ্ঠান করছেন চিরপরিচিত ইঞ্চি আটেকের ‘শিবলিঙ্গ’, সঙ্গে ডুগডুগি বাঁধা ত্রিশূল ।

সতপন্থ তাল পাহাড় ঘেরা স্বচ্ছ জলের ত্রিকোনাকার জলাশয়; যেন মাটির বুকে ভারতের মানচিত্র ।

স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, এরই তিন দিকে নাকি তিন ধ্যানরত দেবতার অধিষ্ঠান; ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর । এঁরা বছরের একটি বিশেষ শুভদিনে এই জলাশয়কে নাকি স্নান পাত্র হিসাবে ব্যবহার করেন ।

সতপন্থ তাল এমনিতে জনমানবশূন্য, তবে এই তালের অপর প্রান্তে পাথরের কুঠিতে থাকেন এক সন্ন্যাসী, পৌঁছেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ আমাদের সম্ভব হয়নি ।

আমরা পৌঁছনোর পর থেকেই পরিবেশ ক্রমশ মেঘাচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে। দুপুর ১২ টা নাগাদ একটু দুরের বস্তু দেখা যাচ্ছে না । সাড়ে ১২ টা থেকে শুরু হল তুষারপাত, তার সঙ্গে কনকনানি হাওয়া, ছোট ছোট তুলোর মত বরফে চারিদিক আচ্ছন্ন ।

বৃষ্টি বা তুষারপাত যাই বলুন না কেন, রুক্ষ-শুষ্ক পরিবেশে দিন তিন-চারেক কটকটে রোদের মধ্যে দিয়ে হাঁটার পর আলাদা মাত্রা এনে দেয় ; তখন আমাদের মনটা এমনিই নেচে ওঠে ।

বর্ষাতি, ছাতা, পঞ্চু যাঁর কাছে যা ছিল গায়ে জড়িয়ে, মাথায় নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটি নাচানাচি হল । উপভোগ করলাম প্রকৃতির মেজাজ বদলকে ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে, সন্ধে গড়িয়ে রাত্রি, তুষারপাতের খামতি নেই, একটানা চলেছে । এ যেন নিম্নচাপের তুষারপাত ।

তাপমাত্রা যথেষ্ট নিচে নেমে গিয়েছে, তাঁবুর ভিতরে চলছে আড্ডা-গল্প-গান । মাঝে মাঝে তাঁবুর একদিকের চেনটা একটু খুলে উপভোগ করছি বাইরের দৃশ্যকে ।

সময়ে সময়ে খাবার এসে যাচ্ছে তাঁবুর ভিতরে । মাঝে মাঝে গাইড এসে লাঠি দিয়ে ঠুকে পরিষ্কার করে দিচ্ছেন তাঁবুর উপরে জমা বরফের আস্তরণ। আমাদের এক পোর্টার, মিঃ কুঁয়ার সিং নেগী, গায়ে তুষার কণা মেখে শোনালেন অপূর্ব সুন্দর গাড়োয়ালি গান ।

সবই ঠিক আছে, বেশ মনের মতন, কিন্তু কষ্টটা হচ্ছিল প্রকৃতির ডাকে মাঝে মাঝে তাঁবুর বাইরে বেরোতেই হচ্ছিল বলে, সব কাজ তো আর ভিতরে হয় না !

থাক সে কথা, এরই মধ্যে আমাদের একজন কিছুটা সময় কাটিয়ে এলেন ঐ সন্ন্যাসীর সঙ্গে ।

তিনি সন্ন্যাসীর আপ্যায়নে আপ্লুত। তাঁর কাছেই শুনলাম সন্ন্যাসী বিবৃত সতপন্থ তালের মহিমা; এই জলে স্নান করলে নাকি যেকোনো ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, এই জলে এমন কিছু উপকারী ব্যাকটিরিয়া আছে যা আমাদের শরীরে আলাদা একটা বল এনে দেয় ।

সন্ন্যাসী নিত্য এই জল স্নান করা থেকে শুরু করে সর্ব কর্মে ব্যবহার করেন এবং প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূলতা জয় করে তিনি সুস্থ থাকতে পারেন।

রাত্রি ৯ টা। ডিনার সম্পূর্ণ কিন্তু বাইরে তুষারপাত হয়েই চলেছে । বাইরে কম তাপমাত্রা হলেও তাঁবুর ভিতরে বেশ আরামেই আছি আমরা । Sleeping Bag-এ ঢুকে গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি ।

২৭ শে মে, ২০১৮, ভোর ৫ টা ; ঘুমটা ভেঙে গেল । তাঁবুর বাইরে এলাম । গাইডের কাছে শুনলাম ভোর ৪ টে পর্যন্ত তুষারপাত চলেছে ।

হঠাৎই ঠান্ডা হওয়া বুঝিয়ে দিল বাইরের তাপমাত্রা কিন্তু এ কী দেখছি! সবই তো সাদা । গতকাল প্রবেশের সময় দেখা সতপন্থ-এর রুক্ষ তীর এক রাতে রূপ বদলে যেন স্বর্গের খুব কাছে পৌঁছে দিয়েছে আমাদের ।

মাটিতে প্রায় বরফের ইঞ্চি পাঁচেকের আস্তরণ । ঝকঝকে আকাশের নীল রঙ প্রতিফলিত হচ্ছে সতপন্থের জলে । উপভোগ করলাম সকালের ‘সতপন্থ’।

আজ আমরা ঠিক করেছি আরও কিলোমিটার দুয়েক এগিয়ে ‘সোমকুন্ড’-এ যাবো, তারপর ফিরে আসব লক্ষ্মীবন পর্যন্ত । গতকালের আবহাওয়া অনুকূল থাকলে আর একটু এগিয়ে ‘সূর্যকুন্ড’ও যাওয়া যেত কিন্তু পরিস্থিতি অনুযায়ীই আমাদের চলতে হবে ।

সকাল ৭ টা, প্রাতঃকৃত্য সেরে মুঠোখানেক কাজু-কিসমিস-বিস্কুট নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু ‘সোমকুন্ড’-এর দিকে। সতপন্থ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় ১৫০ ফুট খাড়াই চড়াই অতিক্রম করে শিরদাঁড়া পথ বা Razor-edged Ridge ।

আমাদের বামদিকে নীলকন্ঠ পর্বতের উত্তর-পশ্চিম পরিসর, ডানদিকে সতপন্থ হিমবাহ এবং তার অপরপ্রান্তেই বালাকুন পর্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম পরিসর, এরই অন্যদিকে আছে ভগীরথ-খড়্গ হিমবাহ ।

বামদিকটা তবুও কিছুটা হলেও ঢালু, কিন্তু ডানদিকে এবড়ো-খেবড়ো পাথরের খাড়াই, যেন গগনচুম্বী অট্টালিকার কার্নিশ ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি।

হালকা চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করতে করতে প্রায় পৌনে ৮ টা নাগাদ পৌঁছলাম ‘সোমকুন্ড’ ; সতপন্থ থেকে পশ্চিমে, সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১৫,৭০০ ফুট উচ্চতায় ।

সতপন্থ থেকেই এদিকটায় কিছু নিশানা পতাকা দেখা গিয়েছিল, এখন দেখলাম নিশানা ছাড়াও কয়েকটি পাথরখন্ড স্তূপকার করে মন্দিরের মতো সাজানো হয়েছে ।

ধূপ-বাতি জ্বালালেন আমাদেরই একজন । সৌন্দর্যের যেন শেষ নেই । আমরা যেন কোনো এক শৃঙ্গের একদম চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছি । আমাদের তিনদিক, প্রায় ৩৬০° জুড়ে পর্বতশৃঙ্খল; নীলকণ্ঠের উত্তর-পশ্চিম পরিসর, বালাকুনের দক্ষিণ-পশ্চিম পরিসর ও চৌখাম্বাকে দেখতে পাচ্ছি একদম গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত ।

বামদিকের পিছনে মাথা তুলে আছে নীলকন্ঠ শৃঙ্গ ।  চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে, নীলকন্ঠ ও চৌখাম্বার সংযোগস্থল, মহাভারতের মহাপ্রস্থান পর্বের ‘যুধিষ্ঠিরের স্বর্গদ্বার’, স্বর্গের সিঁড়ি; যেন একটা লাফ দিলেই পৌঁছে যাব ।

যুধিষ্ঠির নাকি এই সিঁড়ি পর্যন্তই গিয়েছিলেন, তারপর স্বর্গের রথ তাঁকে সশরীরে পৌঁছে দেয় অন্তিম গন্তব্যে ।

গাইডের কথা অনুযায়ী, হাতের সামনে ‘স্বর্গারোহন’ প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরত্বে । এখানে পৌঁছে আমার খুব আশ্চর্য লেগেছে এই ভেবে যে, কত যুগ আগে মানুষ আবিষ্কার করেছেন এই পথ, কতদিন ধরে ভ্রমণ করেছেন এমনই বিপদসঙ্কুল পথে শুধুমাত্র অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার কৌতূহলে; সৃষ্টি করেছেন কত বিস্ময়কর সাহিত্য । অপূর্ব…!

ক্ষিদে পেয়েছে, পেটের মধ্যে ছুঁচোর দৌড়াদৌড়ি আমি মোটেও বরদাস্ত করতে পারি না । একটা পাথরের উপর বসে, কাজু-কিসমিস গুলোর সৎ ব্যবহার করে ফেললাম ।

প্রায় আধঘন্টার মত আমরা ছিলাম, সত্যি বলতে কি সামনে থেকে চোখ নামাতে পারিনি । আরও কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আজ অনেকটা দূরত্ব ফিরে আসতে হবে ।

কি আর করা, ফিরতে থাকলাম একই পথে। ফেরার সময় লক্ষ্য করলাম, অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে অলকাপুরী।

সকাল প্রায় সাড়ে ৯ টা, সতপন্থ ফিরে এলাম । আমাদের ৫ জনের দলে ২ জন পুণ্যস্নান করলেন সতপন্থ-এর জলে । না, আমি করিনি । তবে লোভ যে একদম হচ্ছিল না, তা নয়, কিন্তু সাহসটাও ঠিক দেখাতে পারলাম না ।

আমি শুধুমাত্র মাথাটা সম্পূর্ণ ধুয়ে নিলাম । পাহাড়ে হাঁটার ক্ষেত্রে, বেশ কিছুদিন স্নান না করা এবং মাথায় সবসময় কিছু না কিছু চাপা থাকার দরুণ মাথাটা কিছুটা হলেও ভারী হয়ে থাকে। আশ্চর্য লাগলো, নিমেষে যেন মাথাটা হালকা হয়ে গেল।

খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে ১০ টা বেজে গেল । একই পথে ফেরা । ফেরার পথে নতুন কিছু আবহাওয়া বা পরিবেশগত  অভিজ্ঞতা হয়নি ।  লক্ষ্মীবন পৌঁছলাম প্রায় বিকাল ৪ টে ।

২৮ শে মে, ২০১৮, আজ আমরা ফিরব মানা গ্রাম ঘুরে বদ্রিনাথ। সত্যি বলতে কি লক্ষ্মীবন ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না । লক্ষ্মীবনের পরিবেশটা আমাদের মায়াজালে জড়িয়ে ফেলেছে, তার মোহময় রূপে আমরা আচ্ছন্ন ছিলাম, কিন্তু উপায় তো নেই, ফিরতেই হবে |

পথ চলা শুরু হল, যাওয়ার সময় ধান্য হিমবাহ যেমন দেখেছিলাম, ফেরার সময় একটু পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম । বসুধারার দিকটায় লম্বা ফাটল । বেশ বুঝতে পারলাম কিছুদিনের মধ্যেই কিছুটা বরফ ভেঙে অলকানন্দা তার ক্ষমতা বৃদ্ধির তালে আছে ।

আমাদের দলের দুইজন ও তিনজন পোর্টার বসুধারাকে আরও বেশি উপলব্ধির জন্য এই হিমবাহকে অতিক্রম করে জলপ্রপাত সম্মুখে গিয়েছিলেন, কিন্তু অলকানন্দার অপর প্রান্তে প্রকট রূপে বসুধারা দৃশ্যমান, তাই আমরা বাকিরা অকারণ কষ্ট (আমার কাছে তাই মনে হয়েছে) আর করলাম না; তবে তাঁদের এই প্রাণোচ্ছল উপলব্ধির জন্য আমাদের বাকিদের পূর্ণ সম্মতি ও সহযোগিতা ছিল।

দুপুর ১ টা নাগাদ কোলাহলহীন, নিস্তব্ধ, প্রাকৃতিক রূপ-লাবণ্যে ভরা স্থান থেকে ফিরে এলাম মানবসভ্যতার কৃত্রিম বেড়াজালে ।

‘সতপন্থ’-র সমগ্র পথ যেমন দিয়েছে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য, তেমনই শিখিয়ে দিয়েছে জীবনের কঠিন সত্যকে; একটা ভুল পদক্ষেপ হতে পারে জীবনের শেষ পদক্ষেপ ।

পাহাড় শিখিয়ে দেয় উদারতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসংযম, সহ্যক্ষমতা, সহযোগিতা; পাশাপাশি দেখিয়ে দেয় হিংস্রতা, সময়ের সাথে সাথে মেজাজ বদল ; সবটাই জীবন।

মানুষ প্রধানত বেড়াতে যান জীবনের বৈচিত্র্য খোঁজার জন্য, তাই বেড়াতে যাওয়ায় থাকে আত্মপোলব্ধি, নিজেকে খুঁজে পাওয়া; তবে এটা খুব ভালোভাবে সম্ভব হয় যদি মনের মতো দল পাওয়া যায় ।

বেড়ানোর জন্য, বিশেষ করে পাহাড়ে হেঁটে ভ্রমণের ক্ষেত্রে গাইড-পোর্টারদের পাশাপাশি দলের ব্যক্তিবর্গের মানসিকতার মিল উপভোগ মাত্রা বাড়িয়ে দেয় ।  এই ভ্রমণে আমরা পাঁচজনের দল ছিলাম ।

প্রথমেই বলা দরকার এই দলে আমি নতুন, সুতরাং একটু ভাবনা তো ছিলই, কিন্তু আমাদের একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সহযোগিতা, সহানুভূতি, সর্বোপরি বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা একটা দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করেছে । এনারা না থাকলে প্রকৃতিকে হয়তো সম্পূর্ণভাবে অনুভব করতে পারতাম না ।

শুধু আমি নয়, আমার বিশ্বাস; আমাদের এই ভ্রমণ, দলের প্রত্যেকেরই স্মৃতির মনিকোঠায় গভীর দাগ কাটবেই; তাই বর্ণনা শেষে এই ব্যক্তিদের সম্পর্কে কিছু কথা আমাকে বলতেই হবে । এ আমার দায়সারা কর্তব্য নয়, আবেগমিশ্রিত অবশ্য করণীয়।

প্রথমেই বলব, কৌশিক ব্যানার্জী মহাশয়ের কথা, এই ভ্রমণে আমার একমাত্র পূর্ব পরিচিত ব্যক্তি, পাশাপাশি আমার খুব কাছের দাদাও। এনার ঝুলিতে পাহাড়ে হেঁটে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি; পাহাড়কে চেনেন, জানেন ।

প্রকৃতিকে কিভাবে আরও উপলব্ধি করতে হয়, আমাদেরকে শিখিয়েছেন । শুধু তাই নয়, ইনি একজন গুণী লেখক, এনার ভ্রমণ কাহিনী পাহাড়কে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়; পাশাপাশি প্রকৃতিকে ফ্রেমবন্দি করার ব্যাপারে আমার কাছে ইনি অদ্বিতীয় ।

এখন বলি, শুভশ্রী ব্যানার্জী মহাশয়ার কথা, ইনি কৌশিকবাবুর সহধর্মিনী । এনার সঙ্গে আমার আলাপ আগে থেকে ছিল না তবে এই ভ্রমণে ইনি হয়ে উঠলেন খুব কাছের ‘দিদি’ ।

দলের প্রত্যেকের প্রতি এনার সর্বদা সজাগ দৃষ্টি । এতো বেশি মানসিক সবল ও সক্ষম মানুষ আমি আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না । পাহাড়ে হেঁটে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এনার ঝুলিতেও অনেক ।

এনারা ছাড়া আমাদের বাকি তিনজনের পাহাড়ের অভিজ্ঞতা স্বল্পই । অভিজ্ঞতার পর্যাপ্ততা থাকলেও, এনাদের সহজ ও সাবলীল বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা ও সহযোগিতা আমাদের সম্পূর্ণ দলের ভ্রমণ অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

এবারে বলি, অমিত মিত্র মহাশয়ের কথা, এনার সঙ্গে আগে আমার কোনোরকম পরিচয় ছিল না, এই ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই আলাপ। হাওড়া স্টেশনেই প্রথম করমর্দন । এমন সহজ, প্রাণোচ্ছল মানুষ আমি আগে দেখিনি, অল্প সময়ের জন্য দুর্বলতার আভাসটুকুও এনার মধ্যে ছিল না । কোনো কিছুতেই এনার আপত্তি নেই ।

প্রকৃতির সঙ্গে যেখানে পুরাণের হাতছানি, সেখানেই এনার প্রবল আগ্রহ । জানার উৎসাহে, হাঁটার গতিতে, পাশাপাশি পুরাণের জ্ঞানে ইনি সর্বাগ্রে ।

সতপন্থ-এ পৌঁছনোর পর তুষারপাতের সময় আমরা যখন তাঁবুর ভিতর আড্ডায় মশগুল, ইনি আড্ডারই ফাঁকে আলাপ জমিয়ে এলেন সন্ন্যাসীর সঙ্গে ।

এবারে আসি, সম্রাট চক্রবর্তী মহাশয়ের কথায়; এনার সঙ্গেও প্রথম করমর্দন হাওড়া স্টেশনেই । কেন জানি না, আমাদের নাম একই হওয়ায় কৌশিকবাবুর একটা মজার ধারণা তৈরি হয়েছিল; একসঙ্গে থাকতে গিয়ে আমরা লড়াই না করি !

এই একটা ব্যাপারে কৌশিকবাবুকে আমরা ভুল প্রমাণ করেছিলাম । বয়স ও মানসিকতা সমসাময়িক হওয়ায় আমাদের বন্ধুত্বও দৃঢ় হয়েছে (নামের মহিমা কিনা জানিনা)। কৌশিকবাবুকে স্বীকার করতেই হয়েছে, আমরা ‘মানিকজোড়’ । সহযোগিতা ও দলের প্রতি দায়িত্বে সম্রাট বাবুও কম যান না; হাত বাড়িয়েই আছেন, ধরলেই হল ।

পৃথিবীতে মানুষ একাই আসেন, একাই যান । এই আসা-যাওয়ার মাঝেই তৈরি হয় বিভিন্ন সম্পর্ক; কিছু প্রয়োজনের, কিছু বন্ধুত্বের ; কিছু নিজের স্বার্থে, কিছু সবার স্বার্থে ।

তাই হয়তো কিছু সম্পর্ক বয়সের ভারে মলিন হয়, কিন্তু কিছু থেকে যায় হৃদয়ে, স্মৃতিতে; নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল, চিরভাস্বর।

                            ************** ধন্যবাদ **************

কিছু তথ্য :-
1.  আমরা এই ভ্রমণ প্যাকেজের মাধ্যমে করি। গাইডের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট হয়, বদ্রিনাথ থেকে বদ্রিনাথ।

২. বদ্রিনাথে পৌঁছানোর পর পুরো দায়িত্ব থাকে গাইডের । Tent, Sleeping Bag, Mattress, রেশন, পোর্টার, সবই গাইড provide করে।

3. বদ্রিনাথের হোটেল এবং খাবারও গাইড provide করে। ২৪ শে মে সন্ধ্যা থেকে ২৯ শে মে দুপুর পর্যন্ত গাইডের দায়িত্বে ছিলাম ।
Rate : মাথা পিছু 10,500/-


লেখাটি যদি তোমার পড়ে ভালো লেগে থাকে তাহলে COMMENT করে তোমার মতামত আমায় অবশ্যই জানিও | আর তুমি যদি চাও নিজের লেখা কবিতা ও ভ্রমন গল্প আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত করতে, তাহলে এখানে ক্লিক করো |

এতক্ষণ সময় দিয়ে পড়ার জন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই Ajob Rahasya Bolg-এর পক্ষ থেকে |

About the author

admin

Hi Readers I’m Bebeto Raha, a Professional Youtuber & a blogger from Kolkata. My hobby is Playing Guitar, Making Youtube Videos, Watching Films. Also I love to read any kinds of knowledgeable book written by any good author.

View all posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *